নানা জাত আর আকারের মাছের সমারোহ নিয়ে শুরু হয়েছে মৌলভীবাজারের শেরপুরে কুশিয়ারা নদীর পাড়ে প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহি মাছের মেলা।
কুয়াশায় চারপাশ ঢাকা পড়েছে সন্ধ্যা নামার আগেই। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কনকনে হাওয়ায় ভর করে বাড়ছে শীত। এমন হিমঝরা রাতে লেপ-কাঁথার মধ্যে না ঢুকে চাদর-মাফলারে কান-মাথা মুড়ে সবাই যাচ্ছেন নদীর পাড়ে।
সোমবার (১৩ জানুয়ারি) বিকেল থেকে হাকালুকি, টাঙ্গুয়া, কুশিয়ারা নদী, হাইল হাওর, কাউয়াদীঘি হাওর, বড় হাওর, সুরমা ও মনু নদীসহ সিলেট অঞ্চলের প্রাকৃতিক জলাশয়ের মাছ নিয়ে আসতে শুরু করেছেন মৎস্য ব্যবসায়ীরা। মৌলভীবাজার, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাওর, নদী, বিলসহ নানা জলাশয়ের মাছ নিয়ে এসেছেন ব্যবসায়ীরা। আই নিউজ রিপোর্ট
বোয়াল, আইড়, বাঘাইড়, চিতল, কাতলা, বাউশ, কালাবাউশ, রুই; ছোট-মঝারি-বড় নানা আকারের মিঠা পানির সু-স্বাদু মাছ। কোনোটার আকার ১৫ কেজি, কোনোটা ৮ কেজি। আবার কোনোটা ৫০ কেজি ছাড়িয়ে গেছে। প্রথম মাছ আসছে আড়তে। পরে সেখান থেকে খুচরা বিক্রিতে সরসরি ক্রেতার কাছে। যেন মাছের মেলা, সমারোহ। বৃহৎ সিলেট অঞ্চলের প্রাকৃতিক জলাশয়ের সু-স্বাদু মাছ।
বৈদ্যুতিক বাতি আর কুপির আলোয় ঝলমলে বড় বড় রুই-কাতলা আর চিতল-বোয়ালের রুপালি শরীর। পাইকার আর খুচরা ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে শীতের রাতে সরগরম হয়ে ওঠেছে কুশিয়ারার পাড়।এর টানে মাছের মেলায় জড়ো হন দেশ-বিদেশের লাখো মানুষ। এটাই বাঙলার ঐতিহ্য।
মৌলভীবাজারের জেলা শহর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে শেরপুর মাছের মেলা ঘুরে স্থানীয় মানুষের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, প্রায় ২ শত বছরের ঐতিহ্য অনুযায়ী প্রতি বাংলা সনের পৌষ মাসের শেষ দিনে কুশিয়ারা নদীর পাড়ে শেরপুরে আয়োজন করা হয়েছে মাছের মেলা।
এখানে রাত গভীর হলেই শুরু হয় বেচাকেনা। দূর-দূরান্ত থেকে মাছ নিয়ে যেমন বিক্রেতারা আসেন, তেমনি আসেন পাইকারেরা ও খুচরা ক্রেতারা। একসঙ্গে বড় আকারের বিভিন্ন জাতের এত মাছ দেখার সুযোগ হাতছাড়া না করতে আসেন অনেক দর্শকও। তাঁরা ঘুরে ঘুরে মাছ দেখেন, দাম জানতে চান।
মেলার মধ্যে ঢুকতেই চোখে পড়ে আড়তে আড়তে স্তূপ করা ছোট-বড় নানা জাতের মাছ। মাছ কিনতে মৌলভীবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থান থেকে এসেছেন পাইকারেরা। একেকটি আড়তে মাছের বাক্স-পেটরা খোলা হয়, আর দরদাম হাঁকা নিয়ে চলছে চিৎকার-চেঁচামেচি।
পাইকারী মাছ ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান আই নিউজকে বলেন, মাছের মেলা এ অঞ্চলের একটি ঐতিহ্য। মেলাকে কেন্দ্র করে এলাকাটি উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। বৃহত্তর সিলেটের মধ্যে মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের বিভিন্ন হাওর-নদীর মাছ ছাড়াও খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর, রাজশাহী, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন স্থানের মাছ আসে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মতিন আই নিউজকে বলেন, এটা সৌখিন মানুষের মেলা। হাজার টাকার নীচে কোন মাছ পাওয়া যায় না। বড় ব্যবসায়ীরা সপ্তাহ খানেক পূর্বে বড় বড় মাছ সংগ্রহ করতে থাকেন। সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা এসে আড়ৎ থেকে ছোট বড় অনেক জাতের মাছ নিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েন। মেলায় ছোট আকারের মাছের দাম হাকানো হয় ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা, মাঝারি সাইজের মাছের দাম হাঁকানো হয় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা এবং বড় সাইজের মাছের দাম ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকাও হাঁকানো হয়। এক রাতেই মাছের মেলায় কোটি কোটি টাকার মাছ বিক্রি হয়ে থাকে। অনেকের ধারণা, এ মেলায় শত কোটি টাকার বাণিজ্য হয়।
সিলেট থেকে এসেছেন প্রবাসি আমিরুল ইসলাম। ১২ হাজার টাকায় কিনেছেন একটি চিতল মাছ। মৌলভীবাজারের আরেক ক্রেতা সাদিকুর রহমান ২৫ হাজার টাকায় কিনেছেন এ অঞ্চলের বিখ্যাত আইড় মাছ। তিনি আই নিউজকে বলেন, দাম বিষয় নয়। শখটাই বড়। পুরো বছর এদিনটার জন্য অপেক্ষা করি। আরেক ক্রেতা আব্দুল হাকিম বলেন, আজকালের ছেলেমেয়েরা মাছ চেনেনা। তাদের মাছ চেনাতেই বাজারে নিয়ে এসেছি।
মাছ ব্যবসায়ী উমেদ মিয়া বলেন, লাখ টাকার মাছ নিয়ে এসেছি। আশা করছি ভালো বিক্রি হবে।
কুশিয়ারা নদীর প্রসিদ্ধ চিতল মাছ মেলায় তুলেছেন শামছুল ইসলাম। প্রায় ২০ কেজি ওজনের চিতল মাছটি ৩২ হাজার টাকা দাম হাঁকছেন শামছুল ইসলাম। হাকালুকি হাওর থেকে বিশাল আকারের ১ জোড়া কাতল ও ১ জোড়া বোয়াল নিয়ে এসেছেন হিরা মিয়া ও লাল মিয়া। কাতলের জোড়ার দাম হাঁকছেন ২৬ হাজার এবং বোয়ালের জোড়ার দাম হাঁকছেন ৪৮ হাজার টাকা।
মাছের এমন দাম শুনে আশপাশের অনেকের চোখ ছানাবড়া অবস্থা দেখে জানালেন, এ রকম দামের অনেক মাছ রাত ১২টার মধ্যেই বিক্রি হয়ে গেছে।
স্থানীয় লোকজন জানান বিভিন্ন সময় মনুর মুখ, পারকুল, শেরপুর বাজারে মাছের মেলার জায়গা বদল হলেও কখনও বন্ধ হয়নি। তাদের দাবি অনুযায়ি দেশের সবচেয়ে বড় মাছের মেলা এটি।
স্থানীয় লোকজন জানান বিভিন্ন সময় মনুর মুখ, পারকুল, শেরপুর বাজারে মাছের মেলার জায়গা বদল হলেও কখনও বন্ধ হয়নি। তাদের দাবি অনুযায়ি দেশের সবচেয়ে বড় মাছের মেলা এটি।
এদিকে এক সময় মেলার অনুসঙ্গী হয়ে ওঠা পুতুল নৃত্যের আড়ালে অশ্লীল নৃত্য এবং জুয়ার আসর এখন আর বসে না। পুলিশ, প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিদের তৎপরতায় এটা সম্ভব হয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা। এতে সাংবাদিকসহ সচেতন মানুষের অন্যতম ভূমিকা রয়েছে।
যেভাবে যেতে হবে
ঢাকা থেকে মৌলভীবাজার যাওয়া যায় বাসে করে। এছাড়া শ্রীমঙ্গলে ট্রেনে যায় যায়। মৌলভীবাজার ও শ্রীমঙ্গল থেকে বাস, সিএনজি চালিত অটোরিকশা কিংবা প্রাইভেট গাড়িতে শেরপুর মাছের মেলায় যাওয়া য়ায।
কোথায় থাকবেন
মৌলভীবাজার জেলা শহর, কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গলে প্রায় শতাধিক আধুনিক হোটেল, রিসোর্ট রয়েছে। আছে পাঁচ তারকা মানের হোটেল থেকে শুরু করে ইকো রিসোর্টও।



0 Comments