ফজরের পর ঘুম : ইসলাম কী বলে ?






ফজরের পর ঘুম : ইসলাম কী বলে ?


ফজর নামাজ আদায়ের পর ঘুমানো ইদানিং অনেকেরই অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বিশেষকরে শহুরে মানুষদের এই অভ্যাস নিত্য দিনের।

আগেকার সময়ে মানুষ সাধারণত ফজরের পর ঘুমাতো না। ফজরের পর তারা হয়তো কুরআন তেলাওয়াত ও জিকির-আজকার করে বই পড়তো অথবা কাজে বের হয়ে যেতো।

ইসলামের শিক্ষাও মূলত এটাই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে এশার পর তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যেতে বলেছেন। আর সকাল বেলা আমাদের রিযিকের মধ্যে বরকত দেয়ার জন্য আল্লাহর নিকট দুআ করেছেন।

তাই অধিক রাত্রি পর্যন্ত জাগ্রত না থেকে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়া সুন্নত। যাতে ফজরের পর ঘুমিয়ে বরকত থেকে মাহরূম হতে না হয়।

হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এশার নামাযের পূর্বে ঘুমানো এবং নামাযের পর অহেতুক গল্প-গুজব করাকে খুব অপছন্দ করতেন। [বোখারি : ৫১৪]

তবে ভালো ও নেক কাজের জন্য এশার পরে জাগ্রত থাকলে সেটা ভিন্ন বিষয়। যেমন, মেহমানের সাথে কথা বলা, ইলমী আলোচনা করা, পরিবারকে সময় দেয়া, ইত্যাদি।

তাড়াতাড়ি ঘুমানোর অনেকগুলো উপরকারিতা রয়েছে। যেমন, ফজর নামাযের জন্য খুব সহজে পূর্ণ শক্তি ও চাঞ্চল্যতার সাথে জাগ্রত হতে পারা। শরীরকে আরাম দেওয়া; কেননা দিনের ঘুম রাত্রের ঘুমের ঘাটতি পূরণ করতে পারে না। শেষ রাতে তাহাজ্জুদের জন্য জাগ্রত হতে ইচ্ছুক ব্যক্তি সহজে জাগ্রত হতে সক্ষম হওয়া। ইত্যাদি।

সুতরাং উত্তম হচ্ছে, এশার পর তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাওয়া এবং ফজরের পর না ঘুমানো।

ফজরের পরের সময়টাতে তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর উম্মতের জন্য বরকতের দুআ করেছেন।

সখর গামেদি রাযি. সূত্রে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর উম্মতের জন্য এ দোয়া করেছেন,

اللَّهُمَّ بَارِكْ لأُمَّتِي فِي بُكُورِهَا

‘হে আল্লাহ, আমার উম্মতের জন্য দিনের শুরু বরকতময় করুন।’
বর্ণনাকারী বলেন, এ জন্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো যুদ্ধ অভিযানে বাহিনী পাঠানোর সময় দিনের শুরুতে পাঠাতেন।
বর্ণনাকারী সখর রাযি. নিজে একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনিও তাঁর ব্যবসায়ী কার্যক্রম ভোরবেলা শুরু করতেন। এতে তাঁর ব্যবসায় অনেক উন্নতি হয় এবং তিনি সীমাহীন প্রাচুর্য লাভ করেন।
[আবু দাউদ: ২৬০৬]

সালফে সালেহীনের মধ্য থেকে অনেকেই উল্লেখিত হাদীসের কারণে ফজরের পরে ঘুমানোকে মাকরূহ মনে করতেন। কেননা, ভোরবেলা ঘুমালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে বরকতের দুআ করেছেন সে বরকত থেকে বঞ্চিত হতে হয়।

উরওয়া ইবন যুবাইর রহ. বলেন, যুবাইর রাযি. তাঁর সন্তানদেরকে ভোরবেলা ঘুমানো থেকে নিষেধ করতেন। উরওয়া রহ. আরো বলেন,

إِنِّي لَأَسْمَعُ بِالرَّجُلِ يَتَصَبَّحُ فَأَزْهَدُ فِيهِ.

অর্থাৎ, আমি যখন কারো সম্পর্কে শুনি, সে ভোরবেলা ঘুমায়, তখন তার প্রতি আমি আগ্রহ হারিয়ে ফেলি।
[মুসান্নাফ ইবনু আবী শাইবা, ৫/২২২]

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. তাঁর এক সন্তানকে ভোরবেলা ঘুমাতে দেখে বলেছিলেন,

أتنام في الساعة التي تُقسَّم فيها الأرزاق؟

অর্থাৎ, ওঠো! তুমি কি এমন সময়ে ঘুমিয়ে আছ, যখন রিজিক বণ্টন করা হয়!
[যাদুল মাআ’দ ৪/২৪১]

শহরে থাকতে থাকতে শহুরে মানুষদের মতো আমারও অধিকাংশ সময় ফজরের পর ঘুমানোর অভ্যাস হয়ে গেছে। যা অবশ্যই পরিত্যাগ করা উচিত। অবশ্য গ্রামে গেলে গ্রামের মানুষদের মতোই না ঘুমানোর চেষ্টা করি। আব্বুও ঘুমানোকে পছন্দ করেন না। তাই রাতে পর্যাপ্ত ঘুম হলে ফজরের পর না ঘুমানোকেই কল্যাণকর মনে করি।

সুতরাং, আমরা এশার পর তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাবো। অহেতুক গল্প-গুজব করবো না। ফজরের নামাজ আদায় করে কুরআন তেলাওয়াত ও জিকির-আজকার করবো। অতঃপর না ঘুমিয়ে হালাল রিযিক অন্বেষণের জন্য বেরিয়ে পড়বো। আর দিনের ক্লান্তি ভাব দূর করতে দুপুরে কাইলুলার সুন্নতটি আদায় করবো।

মহান আল্লাহ তাআলা প্রত্যেককে ফজরের পরের বরকতময় সময়টাকে সৎভাবে কাজে লাগানোর এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতিটি সুন্নত সঠিকভাবে আদায় করার তাওফিক দিন। আমীন।

Post a Comment

0 Comments